নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
ব্যস্ততার শহর ছেড়ে, দায়বদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে, হৃদয়ের টানে একদিনের জন্য সবাই মিলেছিলাম—ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে, আনন্দের খোঁজে।
===========================================
বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের উদ্যোগে ট্রাস্টি বোর্ড ও লোকাল এডভাইজারী কমিটির সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এই আনন্দ ভ্রমণ শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না; ছিল স্মৃতি তৈরির এক অনন্য অধ্যায়, ছিল প্রবাস ও স্বদেশের মানুষের হৃদয়ের সেতুবন্ধন।
যেখানে অধিকাংশ ট্রাস্টির নিজস্ব প্রাইভেট গাড়ি রয়েছে, সেখানে সব ভেদাভেদ ভুলে একসাথে একটি বাসে যাত্রা—এই সিদ্ধান্তই বলে দেয় আয়োজনের দর্শন। ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে সম্মিলিত আনন্দই ছিল মূল প্রেরণা। যুক্তরাজ্য প্রবাসী ৩০ জন ট্রাস্টি এবং দেশের মাটিতে থাকা এডভাইজারী কমিটির ১০ জন সদস্য—মোট ৪০ জনের একটি পরিবার সেদিন এক বাসে, এক গন্তব্যে, এক অনুভূতিতে যাত্রা শুরু করেছিল।
কোরআনের তেলাওয়াতে যাত্রার সূচনা
সকাল ঠিক ১০টায়, বিশ্বনাথ থেকে যাত্রা শুরু হয়। আবুল কালামের হৃদয়ছোঁয়া কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সফর যেন শুরুতেই আল্লাহর রহমত ও বরকতে সিক্ত হয়ে যায়। বাসভর্তি মানুষের মুখে তখন উচ্ছ্বাস, কৌতূহল আর শিশুর মতো আনন্দ।
হবিগঞ্জী বাস—নাম শুনে অনেকের মনে ছিল শঙ্কা। কিন্তু সেই শঙ্কা মুহূর্তেই কেটে যায় চালকের দক্ষতায়। পাহাড়ি পথ, সরু রাস্তা, আঁকাবাঁকা বাঁক—সবকিছুই তিনি সামলেছেন দায়িত্ব আর পেশাদারিত্বের সঙ্গে। ভয়ের বদলে জন্ম নেয় ভরসা।
লটারি, হাসি আর কলা বনের নাস্তা
বাস চলমান অবস্থাতেই শুরু হয় এক মজার আয়োজন—ভাগ্য লটারি। টোকেন তুলে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জিতে নেন শরিফুল ইসলাম। মুহূর্তেই বাসজুড়ে হাসি, করতালি আর খুনসুটি। এই ছোট্ট আয়োজন যেন সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবে।
এরপর কলার সাথে বন রুটির নাস্তা খাওয়া ভ্রমণে যেনো অমৃত! ততক্ষণে আমরা নবীগঞ্জের পানি উমদা বাজার অতিক্রম করছি। প্রকৃতি আর মানুষের আন্তরিকতায় মিলেমিশে এক অনাবিল আনন্দ।
চা বাগানের পথে, প্রকৃতির কোলে
চা বাগানের সরু রাস্তা, উঁচু-নিচু পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ—বাস হেলেধুলে চললেও কারও মুখে বিরক্তি নেই। জানালার বাইরে সবুজের হাতছানি, ভেতরে গল্প আর হাসি। প্রকৃতি যেনো নিজ হাতে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।
ঠিক দুপুর ১২টায় পৌঁছাই হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়ার চা বাগান রিসোর্টের বাংলোয়। সেখানে পৌঁছেই শুরু হয় আনন্দের আরেক অধ্যায়।
এরপর আনন্দের সাথে-ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বেলুন ফুলানো, হাঁড়ি ভাঙা, বালিশ খেলা, বল নিক্ষেপ, অভিনয়, কোরআন তেলাওয়াত, গান, কুইজ, ব্যাডমিন্টন, চেয়ার দৌড়সহ মোট ১৮টি ইভেন্টে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। বয়স, পদবি, অবস্থান—সব ভুলে সবাই তখন একজন খেলোয়াড়, একজন অংশগ্রহণকারী।
সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বালিশ বদল খেলা আর
গান প্রতিযোগিতা। আর এই পর্বে সবাইকে চমকে দিয়ে একের পর এক তিনটি গান পরিবেশন করে আসর মাতিয়ে তোলেন সদর ইউপি চেয়ারম্যান দয়াল উদ্দিন তালুকদার। হাততালি, উল্লাস আর হাসিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো চা বাগান। এরপর গ্লাস থেকে চামচ দিয়ে খালি বোতলে পানিভরা ইভেন্টে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মাফিজ খান প্রতিযোগিতাকে জমজমাট করে তুলেন। একইভাবে ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান মিছবাহ উদ্দিন ঝুড়িতে বোতল নিক্ষেপ ইভেন্টে একাই যেন এক-শ হয়ে উঠেন। প্রায় সকলেই জিতে নেন পুরুষ্কার। বাংলোর সামনেই পুরুষ্কার বিতরণ শেষে দুপুর আড়াইটায় পরিবেশিত হয় মধ্যাহ্নভোজ। ক্লান্তি দুর হয় চা বাগানের বাংলোর কর্তৃপক্ষের পরিবেশনায় বাহারি আইটেমের খাবারের—স্বাদ, খাবারের টেবিলেও চলছিল গল্প, স্মৃতিচারণ আর প্রবাস।জীবনের না বলা কথা।
লাল শাপলার লেক আর ইতিহাসের স্পর্শ খাবার শেষে শুরু হয় প্রকৃতি ভ্রমণ। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ ধরে চা বাগানের ছোট আঁকাবাঁকা রাস্তায় হাঁটা, লাল শাপলার লেকে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, সবুজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলা—এই মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরা পড়লেও হৃদয়ে গেঁথে থাকে আরও গভীরে।
এরপর পরিদর্শন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সেনানিবাস—তেলিয়াপাড়া। ইতিহাসের সেই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে অনেকেই নীরব হয়ে যান। স্বাধীনতার গল্প যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
তেলিয়াপাড়ার ছোট ছোট মাটির দালান, পরিচ্ছন্ন সাজানো বাড়িগুলো চোখে পড়ার মতো। গ্রামীণ সৌন্দর্য আর শৃঙ্খলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ছবি তোলা শেষে আসরের নামাজ আদায় করে সবাই ফেরার পথে রওনা হন। বাহুবলের একটি বাজারে মাগরিবের নামাজ শেষে বসে চায়ের আড্ডা। স্থানীয়দের সঙ্গে নির্বাচন, সমাজ আর উন্নয়ন নিয়ে আলাপ—আড্ডার মাঝেও দায়িত্ববোধ।
রাত ৮টায় বাসটি বিশ্বনাথে এসে থামে। বিদায়ের মুহূর্তে কারও চোখে ক্লান্তি নেই, আছে তৃপ্তি। হাসিমুখে একে অপরকে বিদায় জানিয়ে সবাই যার যার ঘরের পথে।
প্রবাসীদের সঙ্গে কাটানো এই একটি দিন ছিল সত্যিই অপূর্ব। আয়োজন ছিল ভিন্নধর্মী, আন্তরিকতায় ভরা। এই ভ্রমণ প্রমাণ করে—সম্পর্কের গভীরতা কিলোমিটারে নয়, অনুভূতিতে মাপা হয়।
বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের এই আয়োজন শুধু আনন্দ ভ্রমণ নয়, এটি ছিল ঐক্য, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের এক জীবন্ত উদাহরণ—যা দীর্ঘদিন স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
এই আনন্দ ভ্রমণে অংশ নেন বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউ.কের চেয়ারপার্সন মোঃ মাফিজ খান, ভাইস চেয়ারপার্সন মিসবাহ উদ্দিন, জয়েন্ট সেক্রেটারী আব্দুর রহিম রঞ্জু, প্রেস এন্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারী শরিফুল ইসলাম, এক্সিকিউটিভ মেম্বার আবুল হোসেন মামুন,গয়াছ মিয়া, আমেরিকা প্রবাসী কমিউনিটি নেতা মুজিব আহমদ মনির, বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের ট্রাস্টী বশির উদ্দিন, হাজী ফারুক মিয়া, বাবরুল হোসেন বাবুল, মোহাম্মদ ফারুক মিয়া, ফয়জুর রহমান,লিলু মিয়া,আব্দুর রব, রফিক মিয়া, মোঃ আবুল কালাম, রুহেল মিয়া, ট্রাস্টের বাংলাদেশ শাখার কো-অর্ডিনেটর নিশি কান্ত পাল, ট্রাস্টের বাংলাদেশ শাখার এডভাইজারী কমিটির সদস্য দয়াল উদ্দিন তালুকদার, রফিকুল ইসলাম জুবায়ের, কাজী মোঃ জামাল উদ্দিন, মতিউর রহমান, তজম্মুল আলী রাজু,ফখরুল ইসলাম, নবীন সুহেল, শিক্ষক মনোয়ার হোসেন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী মিজানুর রহমান, বাবুল হোসেন,ট্রাস্টের বাংলাদেশ শাখার আইটি শিক্ষক সালেহ আহমদ সাকি ও অফিস সহকারী আল আমিন।